ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
বাংলাদেশে নিযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র মিশরের দূতাবাসের উদ্যোগে মিশরের ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের ৭৪তম বার্ষিকী জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে। রোববার (১৯ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মিশরের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের নানা দিক তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, এমপি। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মিশরের রাষ্ট্রদূত ওমর ফাহমি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, মিশরের জাতীয় দিবস এবং ৭৪তম জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে উপস্থিত থাকতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি বাংলাদেশ সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে মিশর সরকার ও দেশটির জনগণের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ ও মিশরের মধ্যে ৫২ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শান্তি ও উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকার এবং ওআইসি ও ডি-৮-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মিশরের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সহযোগিতা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করেছে। তাদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পারস্পরিক আস্থা আজও বাংলাদেশ-মিশর সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, শিক্ষা, নিরাপত্তা, পর্যটন এবং ঢাকা-কায়রো সরাসরি বিমান যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বেশি উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে বলেন, আল-আজহার বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সেখানে অধিকতর শিক্ষার সুযোগ ধর্মীয় শিক্ষা ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মিশর সরকারের বৃত্তি কর্মসূচির প্রশংসা করে তিনি বলেন, আল-আজহারসহ বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রদান এবং মিশরে কর্মরত বাংলাদেশি দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার বন্ধুত্ব, পারস্পরিক কল্যাণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অংশীদারিত্বভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার মিশরের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, শিক্ষা, পর্যটন, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি মিশরের সরকার, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, পর্যটন এবং আতিথেয়তা খাতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মিশরের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিশরের রাষ্ট্রদূত ওমর ফাহমির সক্রিয় ভূমিকারও প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে রাষ্ট্রদূত ওমর ফাহমি বলেন, ১৯৫২ সালের জুলাই বিপ্লব আধুনিক মিশরের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতান্ত্রিক মিশরের যাত্রা শুরু হয়। দুর্নীতি দূরীকরণ, বিদেশি প্রভাবের অবসান, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে এ বিপ্লব আধুনিক মিশরের ভিত্তি রচনা করে।
তিনি এ বছরের সফল জাতীয় নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাফল্য কামনা করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল মিশর এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫২ বছর আজ পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাষ্ট্রদূত বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম আরব সফরকারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার এল-সাদাতের ঢাকা সফর দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্তমানে কূটনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিচার বিভাগীয় সহযোগিতা, ধর্মীয় সংলাপ, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত বছর কায়রোতে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের বৈঠক, ফরেন অফিস কনসালটেশন এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির মিশর সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ওআইসি, ডি-৮ এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ও মিশর আন্তর্জাতিক শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং ইউনেস্কোর মহাপরিচালক পদে ড. খালেদ এল-এনানির প্রার্থিতায় বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, মাত্র দুই বছরে বাংলাদেশ ও মিশরের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। মিশর বাংলাদেশে পেট্রোকেমিক্যাল, সারসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য রপ্তানি করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও পাটজাত পণ্য মিশরের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুরোধে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আল-আজহারে বার্ষিক বৃত্তির সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২৪ করা হয়েছে। বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আল-আজহার এবং মিশরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে।
তিনি আরও বলেন, এ বছর বাংলাদেশে মিশরীয় কপটিক অর্থোডক্স চার্চ প্রতিষ্ঠা দুই দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধর্মীয় সহাবস্থান ও বন্ধুত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাশাপাশি ইজিপ্টএয়ারের ঢাকা-কায়রো সরাসরি ফ্লাইট দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, পর্যটন, ব্যবসা, শিক্ষা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং বাংলাদেশি হজযাত্রীদের জন্যও এটি একটি কার্যকর সংযোগে পরিণত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, সামরিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত বিনিময় এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, মিশর ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামের উদ্বোধন, ইউনেস্কোর মহাপরিচালক পদে প্রথম আরব হিসেবে ড. খালেদ এল-এনানির নির্বাচিত হওয়া এবং ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মিশরের ঐতিহাসিক উত্তরণ দেশের অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
রাষ্ট্রদূত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও মিশরের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন লক্ষ্য এবং জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের ভিত্তিতে আরও সুদৃঢ় হবে এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
অনুষ্ঠিানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অতিথিরা বাংলাদেশ ও মিশরের ৫২ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।











