July 27, 2026

শিরোনাম
  • Home
  • আন্তর্জাতিক
  • চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (CEIZ)-এর নির্মাণকাজ শুরু

চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (CEIZ)-এর নির্মাণকাজ শুরু

Image

ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রতিষ্ঠিতব্য চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (CEIZ)-এর নির্মাণকাজের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে আজ সোমবার (২৭ জুলাই, ২০২৬)।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে CEIZ একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মহামান্য ইয়াও ওয়েন (Yao Wen) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) আশিক চৌধুরী।

মাননীয় ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। এ সময় চট্টগ্রামের স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (CEIZ) প্রকল্পের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (CRBC) ভাইস প্রেসিডেন্ট Li Changgui এবং বাংলাদেশ CEIZ কোম্পানি লিমিটেডের (BCCL) চেয়ারম্যান Wang Benqian-ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীসহ প্রায় ৭০ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে কয়েকটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, CEIZ-এর ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন করা হয় এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে CEIZ-এর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।

চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (CRBC) ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুই বলেন, “আজকের গ্রাউন্ডব্রেকিংয়ের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল, যার সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন দায়িত্ব ও প্রত্যাশা। সিইআইজেড-এর নির্মাণ ও পরিচালনা এগিয়ে নিতে সিআরবিসি সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। দ্বিপাক্ষিক শিল্প সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার একটি মডেল জোন হিসেবে সিইআইজেডকে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। দুই দেশের অভিন্ন উন্নয়নে আমরা আরও বড় অবদান রাখতে চাই।”

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এইচ.ই. ইয়াও ওয়েন বলেন, “চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের আজকের গ্রাউন্ডব্রেকিং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ফলাফল বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নতুন ঐতিহাসিক সূচনালগ্নে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও এগিয়ে নিতে, কৌশলগত সমন্বয় গভীর করতে এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত। দুই দেশের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যকে উন্নয়নের বাস্তব সুফলে রূপ দিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।”

মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের সবার লক্ষ্য একটিই—বিনিয়োগ। দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি হবে বিনিয়োগ। চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের আজকের অগ্রগতি তাই সরকারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।”

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমাদের বার্তা স্পষ্ট: বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, এবং আমরা এ বিষয়ে আন্তরিক। আজকের গ্রাউন্ডব্রেকিং শুধু নির্মাণকাজের সূচনা নয়; এটি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সেতুবন্ধনের ভিত্তি। আমরা একসঙ্গে এমন একটি জোন গড়ে তুলতে চাই, যা নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, টেকসই প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।”

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “জুন মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং ও দালিয়ান সফরের পর ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই জোনে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত একটি কারখানা স্থাপন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লেগে যায়। আমরা ইতোমধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যার মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর কাজ ১৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে বহু দশকের অভিজ্ঞতার তুলনায় এটি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।”

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে CEIZ প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে। জিটুজি (Government-to-Government) উদ্যোগের আওতায় বাস্তবায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরের চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি CEIZ বাস্তবায়নের জন্য গঠিত Bangladesh CEIZ Company Limited-এর সঙ্গে Development Agreement এবং Land Lease Agreement অনুমোদন করে। এ কোম্পানিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ৩০ শতাংশ এবং China Road and Bridge Corporation (CRBC) ৭০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে। বেজার অংশ হিসেবে অধিগ্রহণকৃত ভূমির ৫০ বছরের লিজমূল্য ইকুইটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ডেভেলপার তাদের অংশ নগদ মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করবে, যা জোনের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত হবে।

CEIZ-এ বিশ্বমানের শিল্প পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে “Supporting Infrastructure Project for Chinese Economic and Industrial Zone” গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে।

প্রায় ৪,১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক রোড, ১,১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেন সড়ক, ২০,০০০ ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (CETP), ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন (DRS), ২০,৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৬০ টন প্রতিদিন ক্ষমতাসম্পন্ন সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৪,১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২,৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং প্রায় ১,৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের অংশ চীনের এক্সিম ব্যাংকের Preferential Buyer’s Credit (PBC) সুবিধার আওতায় প্রাপ্তির প্রস্তাব রয়েছে।

এই অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে CEIZ-এ শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও জেটি সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক মানের সকল সহায়ক অবকাঠামো নিশ্চিত হবে। ইতোমধ্যে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেজা, চট্টগ্রাম ওয়াসা (CWASA) এবং CRBC-এর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, এই প্রকল্পটি নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বিশেষত তৃতীয় অধ্যায় “অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার”-এর অধীন (ক) কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বাধিক প্রাধান্য, (খ) বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এবং (গ) অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিল্পপার্কের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণের সঙ্গে এটি সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এছাড়াও প্রকল্পটি নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর চতুর্থ অধ্যায় “অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন”-এর অধীন “চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা” লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কর্মসংস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

Scroll to Top