সম্পাদক, মোহাম্মদ সজীবুল-আল-রাজীবঃ
নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা), এমপি। তিনি বলেন, নারীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দেশ উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। নারীকে ক্ষমতায়ন করা কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি দেশের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার একটি কার্যকর কৌশল।
রবিবার (২৬ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর শেরাটন ঢাকার গ্র্যান্ড বলরুমে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই) আয়োজিত ‘জাপান–বাংলাদেশ বিজনেস উইমেন কনফারেন্স’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেট্রো ঢাকা এবং জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকা (জেসিআইএডি)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল “Empowering Women in Business: Driving Sustainable Growth in Bangladesh through ‘Give to Gain’।”
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা এখন একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। তিনি জাপান সরকার, বাংলাদেশে জাপানের দূতাবাস, জাইকা, জেট্রো এবং জেবিসিসিআই-এর দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই অংশীদারিত্ব দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে এবং ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
আফরোজা খানম (রিতা) বলেন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে বাংলাদেশের নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নারীদের অবদান দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে এখনও অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশ, নেতৃত্বের সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যা সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘Give to Gain’ দর্শনের মূল বার্তা হলো—সুযোগ সৃষ্টি করলে উদ্ভাবন আসে, সহযোগিতা করলে সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং ব্যবসা, শিল্প এবং জাতীয় অর্থনীতিরও টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাইকা বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো।
স্বাগত বক্তব্যে জেবিসিসিআই-এর সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া (জুন) বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের একটি পার্শ্ব বিষয় হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির অন্যতম শক্তিশালী কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, নারীদের শুধু কর্মসংস্থানে নয়, মালিকানা, নির্বাহী নেতৃত্ব, বৃহৎ পরিসরের উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সুযোগ বাড়ায়, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা যদি মেন্টরশিপ প্রদান করেন এবং নেতৃত্বের পদে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়, তাহলে এর সুফল হিসেবে শক্তিশালী ব্যবসা, উন্নত করপোরেট সুশাসন, অধিক কর্মসংস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জেসিআইএডি-এর সভাপতি ইউজি ওয়াগাতা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেবিসিসিআই-এর সেক্রেটারি জেনারেল মারিয়া হাওলাদার এফসিএ এবং ইউগ্লিনা জিজি লিমিটেডের কো-সিইও শিওরি ওনিশি। এছাড়া ‘মনের বন্ধু’-এর প্রতিষ্ঠাতা তাওহিদা শিরোপা তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা তুলে ধরেন। ইউগ্লিনা কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট এবং ইউগ্লিনা জিজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিতসুরু ইজুমোও বক্তব্য দেন।
মারিয়া হাওলাদার এফসিএ-এর সঞ্চালনায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় ব্যবসা ও নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণের পথে বিদ্যমান কাঠামোগত, আর্থিক, সামাজিক ও পেশাগত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ নেন এ. কাসেম অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার আখতার সানজিদা কাসেম, জেট্রো ঢাকার কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ও জেবিসিসিআই-এর জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল কাজুইকি কাতাওকা, মারুবেনি করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার ইউরি মিয়াগাওয়া, প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-এর অধ্যাপক ও ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন।
প্যানেল আলোচনায় নারীদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, পেশাগত দক্ষতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, করপোরেট ক্রয়নীতি, আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসাকে বিনিয়োগ-উপযোগী, রপ্তানি-উপযোগী এবং জাপানসহ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়।সম্মেলন থেকে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ জোরদারে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি ও গ্রোথ ফাইন্যান্স সুবিধা চালু, সরকারি ও করপোরেট ক্রয়ে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নিরাপদ ও পরিবারবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, করপোরেট বোর্ড ও নির্বাহী পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, লিঙ্গভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ জোরদার এবং জেবিসিসিআই, জাইকা, জেট্রো, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও জাপানি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণে ‘বাংলাদেশ–জাপান উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অ্যাক্সিলারেটর’ গঠনের সুপারিশ করা হয়।
জেবিসিসিআই নারী উদ্যোক্তা, করপোরেট নির্বাহী এবং বোর্ড-প্রস্তুত পেশাজীবীদের একটি যাচাইকৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ‘জাপান–বাংলাদেশ উইমেন ইন বিজনেস প্ল্যাটফর্ম’ প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব দেয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মেন্টরশিপ, ব্যবসায়িক সংযোগ, করপোরেট প্রকিউরমেন্ট, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ, রপ্তানি প্রস্তুতি এবং জাপানি করপোরেট নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদারে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রয়াত কাজুকো ভূঁইয়া সেনসেই-এর মৃত্যুর দশম বার্ষিকীতে বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এছাড়া অতিথি, বক্তা, প্যানেলিস্ট এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
সমাপনী বক্তব্যে জেবিসিসিআই-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিরোআকি ওউরা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ-জাপান ব্যবসায়িক সহযোগিতা আরও জোরদারে সংগঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সম্মেলন শেষে নারী-মালিকানাধীন ব্যবসার জন্য করপোরেট সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি, অর্থায়নের পরিধি বৃদ্ধি, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে জাপান ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে বাস্তবভিত্তিক ও পরিমাপযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।











