ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
আসিয়ানের ৫৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার (১০ আগস্ট, ২০২৬) রাতে বাংলাদেশে নিযুক্ত আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সমন্বয়ে গঠিত আসিয়ান ঢাকা কমিটি (ASEAN Dhaka Committee—ADC) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

প্রতি বছর ৮ আগস্ট আসিয়ান দিবস পালিত হয়। ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস (ASEAN) প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করে এ দিবস পালন করা হয়। প্রায় ছয় দশক ধরে আসিয়ান আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভিন্ন সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এ বছরের আসিয়ান দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ফিলিপাইনের ২০২৬ সালের চেয়ারশিপের থিম—“Navigating Our Future, Together”। এ থিমের আওতায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সংযোগ আরও স্থিতিশীল করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, বেসরকারি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।


অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আসিয়ান ঢাকা কমিটির চেয়ার ও বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান। এরপর ২০২৬ সালে আসিয়ানের চেয়ারশিপ পালনকারী ফিলিপাইনের পক্ষে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত নিনা পাদিলা কেইংলেট। অনুষ্ঠানে আসিয়ান ঢাকা কমিটির ২০২৬ সালের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সম্পৃক্ততা নিয়ে একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি ফিলিপাইনের ২০২৬ সালের আসিয়ান চেয়ারশিপের ওপরও একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত এ বন্ধন স্থল ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ, শক্তিশালী জনসম্পৃক্ততা এবং সুদৃঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে আরও গভীর হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব সংযোগকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক কল্যাণ ও অভিন্ন স্বার্থে বাংলাদেশ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আসিয়ান ও এর ১১টি সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে মালয়েশিয়া সফর করেছেন। তাঁর এ সফর বাংলাদেশ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে আসিয়ানের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই করার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আসিয়ানের Sectoral Dialogue Partner (SDP) হওয়ার জন্য আবেদন করেছে। আসিয়ানের সঙ্গে খাতভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার বাজেটে ‘Bangladesh-ASEAN Cooperation Project on Fisheries and Aquaculture’ বাস্তবায়িত হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন খাতে আরও কয়েকটি সহযোগিতা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বাংলাদেশ যাতে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারের মর্যাদা অর্জন করতে পারে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মিশনপ্রধানদের সহযোগিতা কামনা করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আসিয়ান বিশ্বের অন্যতম সফল আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। আসিয়ান পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারলে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও অর্থবহ, টেকসই ও বহুমাত্রিক হবে।
অনুষ্ঠানে আসিয়ান ঢাকা কমিটির চেয়ার ও বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত নিনা পাদিলা কেইংলেটসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ কৃষি, প্রাণিসম্পদ, খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। অতিথিদের আপ্যায়নে অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও স্বতন্ত্র জিআই পণ্য ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট’ এবং দেশীয় ঐতিহ্যের জনপ্রিয় খাবার কালোজিরা চালের বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়। এসব খাবার ও পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও খাদ্যঐতিহ্যের বৈচিত্র্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর কূটনীতিক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয়।
প্রায় ছয় দশকের আঞ্চলিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতায় আসিয়ান শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তার প্রশংসা করে বক্তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, আইসিটি, সংস্কৃতি ও জনসম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আসিয়ানের ৫৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজন বাংলাদেশ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে।











