মোহাম্মদ সজীবুল-আল-রাজীবঃ
ঢাকায় অবস্থিত মরক্কো দূতাবাস যথাযোগ্য মর্যাদায় মরক্কো রাজ্যের মহামান্য রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের (His Majesty King Mohammed VI) সিংহাসনে আরোহণের ২৭তম বার্ষিকী (Throne Day) উদযাপন করেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি মরক্কোর রাজা, সরকার ও জনগণকে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, মহামান্য রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের দূরদর্শী নেতৃত্বে মরক্কো জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশটি শান্তি, সংযম ও অগ্রগতির একটি আঞ্চলিক মডেল হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও মরক্কোর সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং যৌথ আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১৩ জুলাই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল মরক্কো। সেই থেকে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
তিনি স্মরণ করেন, ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আল-কুদস কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে মরক্কো সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। জাতিসংঘ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC) এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও মরক্কো ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি খাতে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা জোরদারে রাবাতে অবস্থিত আইসেস্কো (ICESCO)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মরক্কোর অবদান প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কারিগরি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মরক্কোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে। উচ্চপর্যায়ের সফর, সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদলের নিয়মিত বিনিময় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যিক সংলাপ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন গতি দিচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মরক্কোর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, ওষুধ, হিমায়িত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে বাংলাদেশ মরক্কোর চাহিদা পূরণে সক্ষম বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, আগামী নভেম্বর মাসে মরক্কো থেকে একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি মরক্কোর উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও বিভিন্ন প্রণোদনার সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদেরও মরক্কোর বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ অন্বেষণের আহ্বান জানান।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকার “বাংলাদেশ ফার্স্ট” পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বন্ধুত্ব, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নকে এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার মরক্কোর সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, শিক্ষা, পর্যটন, সংস্কৃতি এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও জোরদারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি ঢাকায় মরক্কো দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে দূতাবাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত মরক্কোর রাষ্ট্রদূত লালা বুথাইনা এল কেরদুদি এল কৌলালি বলেন, থ্রোন ডে মরক্কোর জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা, বৈচিত্র্য এবং শান্তি, শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার গভীর মূল্যবোধের প্রতীক। বাংলাদেশের প্রথম নারী মরক্কোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই প্রথম তিনি এ আয়োজনের মাধ্যমে থ্রোন ডে উদযাপন করছেন, যা তাঁর জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তা এবং উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও মরক্কোর বন্ধুত্বের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠলেও দুই দেশের ঐতিহাসিক যোগাযোগ আরও বহু পুরোনো। প্রখ্যাত মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা শতাব্দী আগে বাংলায় সফর করে তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে এ অঞ্চলের সৌন্দর্য, আতিথেয়তা ও সমৃদ্ধির বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা দুই জাতির মধ্যে ঐতিহাসিক সেতুবন্ধনের প্রতীক।
তিনি বলেন, দুই দেশ জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে একে অপরকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ইউনেস্কোর মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী ‘কাফতান’ অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য তিনি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব লাভ করায় অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক মর্যাদার স্বীকৃতি এবং এ সময়ে মরক্কো বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের রাবাত সফর এবং মরক্কোর শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, বর্তমানে মরক্কো আফ্রিকার অন্যতম শিল্প, লজিস্টিকস ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিস্তৃত অবকাঠামো, বিশ্বমানের সমুদ্রবন্দর, অসংখ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং নাইজেরিয়া-মরক্কো গ্যাস পাইপলাইন ও আটলান্টিক আফ্রিকা ইনিশিয়েটিভের মতো বৃহৎ উদ্যোগের মাধ্যমে মরক্কো আফ্রিকা ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৃহৎ জনসংখ্যা ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান মরক্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। টেক্সটাইল, ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষা ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে যৌথ সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
মরক্কোর রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তায় মরক্কোর সার রপ্তানির বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়, বরং যৌথ সমৃদ্ধি ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব।
তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও মরক্কোর জনগণের মধ্যে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অসাধারণ মিল রয়েছে। বাংলাদেশি ও মরক্কোর নাগরিকদের পারিবারিক বন্ধন দুই দেশের জনগণের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। তিনি বিশ্বকাপে মরক্কোর জাতীয় ফুটবল দল ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’-এর প্রতি বাংলাদেশিদের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশও বিশ্বকাপে অংশ নেবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে অতিথিদের উপস্থিতিতে কেক কেটে মরক্কোর সিংহাসনে আরোহণের ২৭তম বার্ষিকী উদযাপন করা হয়। পরে নৈশভোজ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অতিথিদের মধ্যে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।











