ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রবিবার (২১ জুন, ২০২৬) মালয়েশিয়া সফর করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর এবং মালয়েশিয়ায় প্রথম সরকারি সফর। বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে এবং বিদ্যমান অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা যৌথ কমিশন সভা (Joint Commission Meeting-JCM) এবং দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ সভা (Bilateral Consultations-BC) দ্রুত পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্মত হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শ্রম সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়মিত সংলাপ ও উচ্চপর্যায়ের সফরের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে দুই দেশ মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (MBFTA) নিয়ে আলোচনার অগ্রগতিকে স্বাগত জানায় এবং ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (JBC) গঠনের অগ্রগতিও ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর ও লজিস্টিকস, হালাল শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।

হালাল শিল্পের বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে দুই দেশ এ খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল সার্টিফিকেশন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হন দুই নেতা।
ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা এবং উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও আইটি খাতের দক্ষ জনশক্তিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে একটি দ্বিপক্ষীয় ট্যালেন্ট সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।
শ্রমবাজারের বিষয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানের প্রশংসা করে। নতুন শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার বর্তমান নীতিমালার আলোকে উভয় দেশ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও বৈষম্যহীন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এ লক্ষ্যে দুই দেশ যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (JWG) বৈঠক আয়োজন এবং বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (MoU) পর্যালোচনা করে নতুন চুক্তির খসড়া প্রণয়নে সম্মত হয়।
শিক্ষা খাতে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অবদানের প্রশংসা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET), যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।
পর্যটন খাতে ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ এবং ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ কর্মসূচির আলোকে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশি পর্যটকদের মালয়েশিয়া সফরে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়।
জ্বালানি খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), জ্বালানি অবকাঠামো ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিষয়ে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ খনিজ সম্পদ আহরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানায়।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন, যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক শিক্ষা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদারের বিষয়ে একমত হন দুই নেতা।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে এবং নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
এছাড়া বাংলাদেশের আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে মালয়েশিয়া প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট RCEP-এ যোগদানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিও সমর্থন জানায় মালয়েশিয়া।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, ফিলিস্তিন ইস্যু, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে দুই নেতা একমত হন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর প্রতিনিধিদলের প্রতি উষ্ণ আতিথেয়তা ও আন্তরিক অভ্যর্থনার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।











