ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবর আলজেরীয় বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো দমন-পীড়নে নিহতদের স্মরণে ৬৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এ উপলক্ষে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, প্রবাসী আলজেরীয়দের অবদান, ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার এবং বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে ১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবরের মর্মান্তিক ঘটনাকে দেশটির জাতীয় চেতনা, আত্মত্যাগ, মর্যাদা ও স্বাধীনতার সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই দিনটি আলজেরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় অভিবাসী দিবস’ হিসেবে পালন করে।

তিনি জানান, ২০২১ সালে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের উদ্যোগে এ দিবসে নিহতদের স্মরণে আলজেরিয়াজুড়ে এবং বিদেশে দেশটির কূটনৈতিক মিশনগুলোতে এক মিনিট নীরবতা পালনের ঐতিহ্য চালু হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—‘গভীর স্মৃতি থেকে ভবিষ্যতের দিগন্তে’—অতীতের বেদনাদায়ক ইতিহাসকে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
প্যারিসে আলজেরীয়দের ওপর দমন-পীড়নের ইতিহাস
আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে ১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবরের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, সেদিন ফরাসি কর্তৃপক্ষের আরোপিত বৈষম্যমূলক কারফিউয়ের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেন আলজেরীয়রা। বিক্ষোভ দমনে ফরাসি পুলিশের সহিংস অভিযানে বহু মানুষ আহত হন এবং বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তাঁদের মধ্যে অনেকে নির্যাতনের শিকার হন এবং কয়েকজনকে সেইন নদীতে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
বক্তব্যে বলা হয়, ফ্রান্সে কর্মরত আলজেরীয় শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ সে সময় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন—ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (এফএলএন) জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা ছিল। বিক্ষোভ দমনের মধ্য দিয়ে এই আর্থিক ও রাজনৈতিক সংযোগ দুর্বল করার প্রচেষ্টাও ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক সংহতি ও স্বাধীনতা অর্জন
আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, প্যারিসের এ হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো আলোচনা আলজেরিয়ার স্বাধীনতার দাবিকে আরও বেগবান করে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টায় ঘটনাটির ঐতিহাসিক সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ফরাসি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ঘটনাটিকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালের এভিয়ান চুক্তি এবং একই বছরের ৫ জুলাই দেশটির আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়।
প্রবাসী আলজেরীয়দের অবদান ও জাতীয় উন্নয়ন
রাষ্ট্রদূত বলেন, আলজেরিয়ার প্রবাসী জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে তারাই দেশের উন্নয়ন, জ্ঞান বিনিময় ও আধুনিকায়নে অবদান রাখছেন।
এ প্রসঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত আলজেরীয় বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে ‘হাই কাউন্সিল অব দ্য ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক কমিউনিটি অ্যাব্রড’ গঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এ পরিষদকে প্রবাসী আলজেরীয়দের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে দেশের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
বাংলাদেশ-আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক বন্ধনের ওপর গুরুত্বারোপ
বক্তব্যের শেষাংশে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার জনগণের মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণই ঔপনিবেশিক শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস ধারণ করে। স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার জন্য উভয় দেশের মানুষের আত্মত্যাগ দুই দেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক সংযোগ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে তিনি স্মরণে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট অতিথি, কূটনীতিক, সাংবাদিক, প্রবাসী আলজেরীয় নাগরিক এবং আয়োজনে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ করে শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।











