ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমন, ডিজিটাল তদন্ত এবং ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে চট্টগ্রামে আধুনিক সাইবার পুলিশ সেন্টার (CPC) উদ্বোধন করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (KOICA) সহায়তায় চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে চারতলাবিশিষ্ট এ সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন KOICA বাংলাদেশ অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিপিএম, মনজুর মোরশেদ চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

প্রায় ১ হাজার ৬৪০ বর্গমিটার আয়তনের এ সেন্টারটি আঞ্চলিক পর্যায়ে সাইবার অপরাধ তদন্ত ও ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ঢাকায় সিআইডির কেন্দ্রীয় সক্ষমতার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে সাইবার অপরাধ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত ও কার্যক্রমভিত্তিক সহায়তা দেবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা KOICA। দেশের অন্যান্য বিভাগেও একই ধরনের সাইবার পুলিশ সেন্টার প্রতিষ্ঠায় KOICA-এর সহায়তা ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন বলেন, ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামে এ সেন্টার প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উন্নত ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা অর্জন করবে এবং উদীয়মান সাইবার হুমকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের জন্য আস্থা প্রয়োজন, আর সেই আস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো নিরাপত্তা। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত এ সাইবার পুলিশ সেন্টার সেই প্রয়োজন পূরণে একটি বাস্তব উদ্যোগ। এটি এ অঞ্চলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি থেকে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
KOICA বাংলাদেশ অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম বলেন, সেন্টারটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর ব্যবহারের ওপর। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে কতগুলো অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে, কতজন ভুক্তভোগী সুরক্ষা পাচ্ছেন এবং কতজন পুলিশ কর্মকর্তা দক্ষতা অর্জন করছেন—এসবের মধ্য দিয়েই এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। চলতি বছরের শেষ দিকে প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত KOICA-এর সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
‘Safer Cyberspace for Digital Bangladesh: Developing National and Regional Cyber Investigation and Digital Forensics Facilities for Bangladesh Police’ শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় এ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত রেকর্ড অব ডিসকাশনের মাধ্যমে প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। এতে KOICA সর্বোচ্চ ৪৮ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো ডিজিটাল তদন্ত ও ফরেনসিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে সিআইডির সক্ষমতা উন্নয়ন এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করা। এ উদ্যোগের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সিআইডির সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের জন্য ফরেনসিক ওয়ার্কস্টেশন, কম্পিউটার ও মোবাইল ফরেনসিক কিট, রাইট ব্লকার, ম্যালওয়্যার বিশ্লেষণ সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে KOICA।
প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রকল্পটিতে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা সিআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তদন্তসংক্রান্ত পরামর্শ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশল, প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং বিভিন্ন কর্মশালায় কাজ করেছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ৭৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা দক্ষিণ কোরিয়ায় আটটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। এসব প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে সাইবার কৌশলগত নেতৃত্ব, ডিজিটাল তদন্ত ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ, হ্যাকিং ও নেটওয়ার্ক ফরেনসিক, ম্যালওয়্যার বিশ্লেষণ, ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) এবং উন্নত কম্পিউটার ও মোবাইল ফরেনসিক।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও উন্নত তদন্তব্যবস্থার সমন্বয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনলাইন জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ তদন্তে সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে অপরাধ তদন্তে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।











