August 20, 2026

শিরোনাম
  • Home
  • আন্তর্জাতিক
  • এআই বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়তে হবে: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ

এআই বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়তে হবে: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ

Image

মোহাম্মদ সজীবুল-আল-রাজীবঃ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত হাতিয়ার নয়; এটি জাতীয় সক্ষমতা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। তাই বাংলাদেশকে এআই ব্যবহারে পিছিয়ে না থেকে সতর্কতা, জনসম্পৃক্ততা, তথ্যের গোপনীয়তা ও যথাযথ নীতিমালার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট, ২০২৬) ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘AI and Governance: Global Technology Architecture, National Digital Public Infrastructure and Policy Directives’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, একুশ শতকের শুরুর দিকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেকটা অবাস্তব ধারণা মনে হলেও পশ্চিমা বিশ্বের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বুয়েট) বহু বছর ধরে এ বিষয়ে পড়ানো হচ্ছিল। বর্তমানে এআই লেখালেখি, বিশ্লেষণ, রোগ নির্ণয়, পূর্বাভাস, কোডিং, গবেষণা ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কাজ করতে সক্ষম।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই এখন জাতীয় শক্তি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুটি প্রতিযোগিতামূলক এআই ইকোসিস্টেমের নেতৃত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রেও গোয়েন্দা কার্যক্রম, নজরদারি, লক্ষ্য নির্ধারণ ও নির্ভুল অভিযানে এআইয়ের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে মেধাবী মানুষের অভাব নেই। তবে শুধু মেধা থাকলেই জাতীয় সক্ষমতা তৈরি হয় না। মেধাকে প্রযুক্তিতে, প্রযুক্তিকে প্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। ছোট দেশ হয়েও ইসরায়েল কীভাবে বিপুলসংখ্যক এআই কোম্পানি গড়ে তুলে প্রযুক্তিগত প্রভাব তৈরি করেছে, তার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল জনসংখ্যা, মেধাবী মানুষ এবং সমাধানযোগ্য অসংখ্য সমস্যা। কিন্তু এসব সুবিধাকে এআই সক্ষমতায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম।

জনপ্রশাসনকে এআই রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফাইল খোঁজা, অন্য দপ্তরে ফোন করা কিংবা কোনো সিদ্ধান্তের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরিবর্তে অনুমোদিত সরকারি তথ্যভান্ডার থেকে এআই সহায়তা নিয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্ট বিধি, পরিপত্র, নজির ও উৎসসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে এআই সরকারি কাজে দক্ষতা বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিভিন্ন স্তরে এআই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশেরও আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকারি ব্যয়, ক্রয় কার্যক্রম, নিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, কর ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা ও ফাইল ব্যবস্থাপনায় এআই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ বিভাগ এআই ব্যবহার করে প্রকল্প প্রণয়ন, ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই এবং প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সরকারের সময় ও অর্থ—দুই-ই সাশ্রয় হতে পারে। একইভাবে চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়তা, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

তবে এআই ব্যবহারের সঙ্গে কর্মসংস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে একজন মানুষ যে কাজ আগে পাঁচ বা দশজন করতেন, তা করতে সক্ষম হতে পারেন। ফলে কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা কমতে পারে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সামাজিক মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অদক্ষতা শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বলে তা সংরক্ষণ করা উচিত নয়। লক্ষ্য হতে হবে ‘AI-assisted government, not human-free government’—অর্থাৎ মানবশূন্য সরকার নয়, বরং এআই-সহায়ক সরকারব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে কার্যকর সমঝোতা, সমন্বয় ও ‘উইন-উইন’ সমাধানের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য পথ বের করতে হবে।

এআই ব্যবহারে জ্বালানি ও তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি। বলেন, এআই পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশের এআই কৌশল প্রণয়নের সঙ্গে জ্বালানি কৌশলকেও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তথ্য গোপনীয়তার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ডিজিটাল বিশ্বে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। এআই ব্যবস্থায় কোন ধরনের তথ্য এবং তথ্যের কোন স্তর শেয়ার করা যাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। জনসচেতনতার অভাবে এআই নতুন ধরনের প্রতারণারও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

এ কারণে জনপ্রশাসনে এআই ব্যবহারের জন্য আইনি ভিত্তি, সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো, তথ্য শ্রেণিবিন্যাস এবং ব্যাপক জনসম্মতির প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা তুলে ধরে মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা ও নির্ভুল অভিযানে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। যেসব দেশ উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা, তথ্য ও অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতের কৌশলগত ভারসাম্যে তাদের প্রভাবও তত বেশি হবে।

তিনি বলেন, ভারত-চীন সীমান্তেও সৈন্যদের পাশাপাশি রোবট, এআই, রোবোটিকস ও আধুনিক অপটিক্যাল প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কৌশল থেকে এআইকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

বক্তব্যের একপর্যায়ে এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বোঝাতে তিনি বলেন, একটি দিয়াশলাই দিয়ে যেমন খাবার রান্না করা যায়, তেমনি বাড়িও পুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এআইও তেমন—এটি সরকারি সেবা উন্নত করতে পারে, আবার নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে; সমৃদ্ধি বাড়াতে পারে, আবার বৈষম্যও বাড়াতে পারে; নাগরিককে ক্ষমতায়িত করতে পারে, আবার নাগরিকের তথ্য উন্মুক্তও করে দিতে পারে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির পার্থক্য নয়, মূল পার্থক্য তৈরি করেন এর চালক বা ব্যবহারকারী। তাই এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিক্ষাবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে এআই গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রধান অতিথি বলেন, যেখানে সরকারি সেবা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ, সেখানে এআই ব্যবহার করে সেবা সহজ ও আধুনিক করতে হবে। জনসম্মতির ভিত্তিতে এআই গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়; বরং যথাযথ নীতি, নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের সমন্বয়ে এর সুফল নিশ্চিত করতে হবে।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, এডব্লিউসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, জি। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোঃ এমদাদ উল বারী, ওএসপি, এনডিসি, পিএসসি, টিই (অব.)।

অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি এবং আইসিটি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট আশফাক জামানও একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান তাঁর বক্তব্যে উদ্ভাবনকে মানবকেন্দ্রিক ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বৈশ্বিক এআই আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে জনকল্যাণে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোঃ এমদাদ উল বারী জাতীয় ইন্টারঅপারেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক, সুস্পষ্ট তথ্য-সম্মতি প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছ এআই সংগ্রহ নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক এআই ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার উদ্যোগে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার ওপরও জোর দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনায় এআই গ্রহণের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ, এআই-সংক্রান্ত নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রণয়নে স্থানীয় চাহিদার ভূমিকা এবং সাইবার কার্যক্রম ও আধুনিক যুদ্ধে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়।

সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

Scroll to Top