February 10, 2026

শিরোনাম
  • Home
  • জাতীয়
  • প্রচলিত ধারা পরিবর্তন করে সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান

প্রচলিত ধারা পরিবর্তন করে সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান

Image

ডেস্ক রিপোর্টঃ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ভাষণের শুরুতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং জুলাইয়ের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। তিনি উল্লেখ করেন, সেই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম, নারী, শ্রমিক, রিকশাচালক, পেশাজীবী মানুষ থেকে শুরু করে দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা আর জুলাই চাই না, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে জনগণকে আর রাস্তায় নামতে না হয়।”

তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ‘নির্বাচনের নামে তামাশা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এসব কারণেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

জামায়াত আমীর বলেন, দেশের তরুণরা এখন একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়—যাকে তারা গর্বের সঙ্গে “বাংলাদেশ ২.০” বলতে পারবে। তিনি বলেন, পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এমন একটি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা ক্ষমতা হারানোর ভয়ে পরিবর্তনকে ঠেকাতে চায়। তবে আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদীসহ শহীদদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে সাহসী করে তুলেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই সাহসী, মেধাবী ও প্রযুক্তি-সচেতন তরুণদের হাতেই ন্যস্ত।

গণভোট প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর অনেকটাই অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এসব সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। তিনি এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

নিজেদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরে জামায়াত আমীর বলেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো তারা পলিসি সামিটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিকৌশল জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আল্লাহ ইচ্ছা করলে এবং জনগণের ভালোবাসায় আমরা সরকার গঠন করলে ফজরের নামাজ আদায় করেই আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করব।”

দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনকারী কেউ কখনো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

আগামী নির্বাচনকে ‘নতুন স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মহাসুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণকে ঠিক করতে হবে তারা কেমন বাংলাদেশ চায়—শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র। তিনি সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

তিনি জানান, জামায়াতের ইশতেহারে ৫টি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ এবং ৫টি বিষয়ে ‘না’ বলার আহ্বান রয়েছে। ‘হ্যাঁ’—সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান; আর ‘না’—দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।

নারী অধিকার বিষয়ে জামায়াত আমীর বলেন, নারীর মর্যাদা রক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ সমৃদ্ধ হতে পারে না। ক্ষমতায় এলে নারীরা সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন এবং তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবার দেশ। কেউ যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ের মধ্যে না থাকে—এটাই তাদের অঙ্গীকার। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি সমমর্যাদার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রবাসীদের অবদান স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনে প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রবাসীদের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন ও সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

ভাষণের শেষাংশে তিনি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। শহীদ ও প্রয়াত নেতাকর্মীদের স্মরণ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একটি আমানত এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য।

শেষে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, “আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ি—যেখানে সবাই মান-ইজ্জত ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে।”

Scroll to Top