বিজনেস ডেস্কঃ
চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি ও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। এই অচলাবস্থাকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ‘মহাবিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে তারা এ সংক্রান্ত একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন।

যৌথ বিবৃতিতে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন অব বাংলাদেশ, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ ও বিজিবিএ-এর সভাপতিবৃন্দ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যা একটি বিরল ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর একদিন বন্ধ থাকলেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয় বলে তারা উল্লেখ করেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বন্দরের অচলাবস্থার কারণে তৈরি পোশাকসহ সব খাতের আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। একদিকে শিল্পকারখানার কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না, অন্যদিকে প্রস্তুত পণ্য বন্দরে আটকে থাকায় শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেওয়া সময়সীমা (ডেডলাইন) রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই পরিস্থিতি আর কয়েক দিন অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং সরিয়ে নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা দেশের রপ্তানি খাতের জন্য মারাত্মক আঘাত হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ববাজারে চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমনিতেই দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাত নজিরবিহীন চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বন্দরের অচলাবস্থায় ভয়াবহ কনটেইনার জট তৈরি হওয়ায় ডেমারেজ চার্জ, পোর্ট চার্জ ও স্টোরেজ রেন্ট দ্রুত বাড়ছে, যা সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত এই ব্যয় আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের ওপর পড়বে উল্লেখ করে নেতারা বলেন, সামনে পবিত্র রমজান মাস। এখনই সংকট নিরসন না হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হবে, ফলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ আরও জানান, শিপমেন্ট বিলম্বিত হওয়ায় ব্যাংক ঋণ ও এলসি ব্যবস্থাপনাতেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সময়মতো দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা পুরো আর্থিক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি বন্দরের অচলাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে বর্তমান সরকারকে বিনীত আহ্বান জানিয়ে বলা হয়,
“দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই মুহূর্তেই বিষয়টির সুরাহা করা জরুরি। এনসিটি ইজারা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, নতুন সরকার চাইলে তা পুনরায় পর্যালোচনা করতে পারে। কিন্তু সে অজুহাতে বন্দর অচল রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
একই সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে নেতারা বলেন,
“আপনারাই এই বন্দরের প্রাণ। দাবি–দাওয়া আদায়ের অধিকার আপনাদের আছে, তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকেই ঝুঁকির মুখে ফেলা। দেশের অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই ব্যতিক্রমী অবস্থান থেকে সরে এসে বন্দর সচল করাই হবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।”
শেষে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার ও আন্দোলনরত পক্ষগুলো দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসে আজই একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাবে। অন্যথায় এই সংকট থেকে উত্তরণ কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।











